প্যারিসের হামলার বিষয়ে যতোটুকু জানা গেছে

প্যারিসের হামলা সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত বিবিসি যা কিছু জানতে পেরেছে:

151114130250_stade_de_france_640x360_afp

রাতের প্যারিসের ব্যস্ততম ও জনপ্রিয় এলাকা টেন্থ ডিস্ট্রিক্টে হামলাকারীরা প্রথম হামলাটি চালায় আনুমানিক রাতটা ৯টা ২০মিনিটের দিকে। রিপাবলিক প্যালেস থেকে এই জায়গাটি খুব বেশি দূরে নয়। প্রায় একই সময়ে স্টেডিয়ামের বাইরে শোনা যায়
বিস্ফোরণের শব্দ। সেখানে জার্মানি ও ফ্রান্সের জাতীয় দলের মধ্যে এক ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো।
গুলির প্রথম খবরটি আসে লা ক্যারিলো নামের একটি বার থেকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রথমে ভেবেছিলেন কোনো পটকা আতসবাজি পোড়ানোর আওয়াজ হয়তো। পরে লোকজন দেখলেন যে মুখোশ পরিহিত এক বন্দুকধারী আধা-স্বয়ংক্রিয় একটি বন্দুক
থেকে গুলি ছুঁড়ছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, একজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে তিনি গাড়ি থেকে নামতে দেখেন। তার পরনে কোনো মুখোশ ছিলো না।

বেন গ্রেন্ট, যিনি সস্ত্রীক ওই বারের পেছনে ছিলেন, তিনি বলেছেন, “লোকজন মাটিতে শুয়ে পড়লো। নিজেদেরকে রক্ষার জন্যে আমরা একটা টেবিলের নিচে আশ্রয় নিলাম।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন তারপর ওই সশস্ত্র ব্যক্তি রাস্তা পার হয়ে একটি রেস্তোরার ওপর হামলা চালাতে শুরু করে।
ওই বন্দুকধারীর গুলিতে ওই বার ও রেস্তোরায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে।
তার কয়েক মিনিট পরেই এই এলাকার কাছেই, রাতের শহরে জমজমাট একটি রাস্তা ক্যানেল সেন্ট মার্টিনে গুলির শব্দ শোনা যায়।

জানা যাচ্ছে, ওখানে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়েছিলো একটি গাড়ি। মাটিতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিলো একটি মোটর বাইক।
তারপরের হামলাটি হয় এই এলাকা থেকে কয়েক রাস্তা দূরে, আরো একটি রেস্তোরায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, একজন বন্দুকধারীকে সেখানে মেশিনগান থেকে গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে।
একজন বলেছেন, “আমার চারপাশে অন্তত পাঁচটি মৃতদেহ পড়েছিলো। আর সবখানে ছিলো শুধু রক্ত আর রক্ত।”
রাত ০৯:৩০ স্তাদ দে ফ্রান্স
প্যারিসের উত্তর প্রান্তে স্টেডিয়ামে জার্মানির জাতীয় ফুটবল দলের সাথে খেলছিলো ফ্রান্স। সেটা ছিলো আন্তর্জাতিক এক প্রীতি ম্যাচ। ইউরো ২০১৬ এর আগে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হিসেবেই দেখা হচ্ছিলো এই খেলাকে। এই ম্যাচটি টিভিতেও সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিলো। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয় ওঁলাদ স্টেডিয়ামে খেলা দেখছিলেন।
খেলা শুরু হওয়ার প্রায় আধ ঘণ্টা পর স্টেডিয়ামের বাইরে প্রথম প্রচণ্ড জোরে বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া যায়। তারপর আরো দুটো বিস্ফোরণ ঘটেছে। স্টেডিয়ামের ভেতর থেকেও এই বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যায়। তারপর দ্বিতীয় বিস্ফোরণ যখন হয় তখন নিরাপত্তার স্বার্থে ফরাসী প্রেসিডেন্টকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পরে জানা গেছে, স্টেডিয়ামের কাছেই স্থানীয় দুটো ফাস্ট ফুডের দোকানে তিনজন আত্মঘাতী হামলাকারী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের মৃত্যু ঘটায়।
ফরাসী সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, ফ্রান্সের ইতিহাসে এই প্রথম এধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এক পর্যায়ে বহু দর্শক আতঙ্কে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থেকে মাঠের ভেতরে নেমে আসে। ম্যাচের পরে ফুটবলাররা টানেলের মনিটরে দেখতে পান ঘটনাটা আসলে কী ছিলো। ওই ম্যাচে ফ্রান্স ২-০ গোলে জয়লাভ করে।
রাত ০৯:৫০
এর পরের গুলির খবর আসে দক্ষিণ থেকে। সেখানে প্রথমে একটি রেস্তোরাঁতে হামলা চালানো হয়। সেখানে দু’জন সশস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি করতে দেখা গেছে। একটি কফি শপের লোকজনের ওপর তারা নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “কমপক্ষে তিন মিনিট ধরে সে গুলি চালায়। তারপর তারা একটি গাড়িতে ওঠে অন্যদিকে চলে যায়।”

ওই বারের বাইরে এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। সেখানে বহু মৃতদেহ মেঝের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়।
রাত ১০:০০কনসার্ট ভেন্যু
তবে রাতের সবচে বড়ো হামলার ঘটনাটি ঘটে সুপরিচিত একটি কনসার্ট হলে। বুলেভার্ড ভলতেয়ারে গান গাইছিলো ক্যালিফোর্নিয়ার রক গ্রুপ ইগলস অফ ডেথ। কনসার্টের দেড় হাজার
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হলের পেছন থেকে চারজন হামলাকারী হামলা চালাতে শুরু করে।উপস্থিত দর্শকদের লক্ষ্য করে তারা গুলি চালাতে থাকে।তাদের হাতে ছিলো কালাশনিকভ রাইফেল।ফরাসী সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, সেখানে অন্তত ৮২ জন নিহত হয়েছে।

জানা গেছে, একজন হামলাকারীকে সেখানে আরবিতে আল্লাহু আকবর বা “আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ” বলে চিৎকার করতে শোনা গেছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, সিরিয়ায় হামলার জন্যে একজন হামলাকারী ফরাসী প্রেসিডেন্টকে দায়ী করছিলো।
তখন পরিষ্কার করে প্রথমবারের মতো জানা গেলো যে ফ্রান্স আবারও ইসলামপন্থীদের আক্রমণের শিকার হয়েছে।
“প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম আতসবাজি কিন্তু শেষে দেখলাম হামলাকারীরা চারদিকে গুলি ছুঁড়ছে। আমরা তখন মেঝেতে শুয়ে পড়ি। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে মঞ্চের দিকে অগ্রসর হতে থাকি।” বলছিলেন একজন নারী।
ততোক্ষণে প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ প্রধানমন্ত্রী মানুয়েল ভাল্স ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে জরুরী বৈঠকে বসেছেন। প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ যেখানে হামলা হয়েছে সেখানে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মাঝরাতের আগেই তিনি জাতীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সারা দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন। সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কনসার্ট হলের তিনজন হামলাকারী বোমা ফাটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দেওয়ার পর জিম্মি দশার অবসান ঘটে। আর চতুর্থ হামলাকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।
সেখানে বেঁচে যাওয়া একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, অনেকেই মঞ্চের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলে বন্দুকধারীরা তাদেরকে গুলি করে হত্যা করেছে। তিনি জানান, হামলাকারীদের একজন ছিলেন শান্তশিষ্ট, কোনো মুখোশ ছিলো না। তার মুখেও কোনো উদ্বেগের ছাপ ছিলো না। বন্দুকধারীরা যখন তাদের কালাশনিকভে গুলি ভরছিলো তখন ওই প্রত্যক্ষদর্শী সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন।

Comments

comments